আমি কী দেখছি?



আমি কী দেখছি? আমি দেখছি স্বজনহারানো আত্মীয়ের হাহাকার, যে হাহাকার কানে ঢুকলে মনে হয় বধির হয়ে গেলে ভালো হত, অথবা অন্ধ, অথবা স্মৃতিলুপ্ত কবন্ধ। 

আর আমি দেখছি মাটিতে পড়ে থাকা অনেকগুলো জুতো-চপ্পলের ছবি, দেখতে চাই না তবু দেখছি বারংবার, "পুজোয় চাই নতুন জুতো" পড়ে আছে মণ্ডপের বাইরে কোথাও, যাঁদের জন্য তাঁরা বেঁচে আছেন কি না জানা নেই। এই দৃশ্য হয়ত বহুবার ফিরে আসবে, ভোলা যাবে না। শামসুর যেমন লিখেছিলেন, "পারবে কি এসব ভীষণ দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন'?" 

তার পাশেই দেখছি, ক্ষমতামাতাল প্রভুকে। তিনি বললেন, রাজনীতি করবেন না। হোমরা-চোমরা-সভাসদ-চাটুকার দেখছি। একজন বললেন, কুছ নাহি হুয়া, সব সেফ হ্যায়, তারপাশে একজন সমস্বরে, জানিয়ে দিলেন কুছ নেহি হুয়া, একদম ইয়ে হামারা বিধানসভা হ্যায় দাদা। আবার তাঁদের প্রভুকে দেখছি, প্রভু এবার বলছেন, তিনি হ্যাপি। উনি এবং ওরা নির্ঘাত মনে মনে জানেন, ওরাই আসলে অক্ষত থেকে যাবেন চিরদিন, আর একটি মায়ের হাহাকার থামতে না থামতেই আরেকটি শুরু হয়ে যাবে।  

এইসবের মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মত, বা শাদা পাতায় শুষে নেওয়া কালির মত দেখে যাচ্ছি ভাঙা স্টল, প্রগতিশীল বইয়ের, চিরায়ত সাহিত্যের। দুজন জঙ্গিসঙ্ঘীকে দেখলাম, জোম্বিই বটে, বাঁশপেটা করার পর অকৃত্রিম আক্রোশে বই তুলে তুলে আছাড় মারছে মাটিতে, আর একজন অশীতিপর মানুষ অনুনয় করছেন, নষ্ট কোরো না, বইগুলো নষ্ট কোরো না। আর আমি ভাবি সহজাত প্রবৃত্তিতেই বই তুলে ওভাবে ছুঁড়তে পারে না মানুষ, হাত সরবে না তার। তাই হয়ত বুলডোজ়ারের সামনে এতজন দাঁড়িয়ে গেলেন, হয়ত একদিন আয়ু বাড়ল। তবে এ যুদ্ধেও আপাতত বুলডোজার-ই জিতবে মনে হয়, বই নয়। তবে, বই না পোড়ালে কী প্রকৃত নাৎসি হওয়া যায়? মনে হয় না। 

ব্রেশটের একটি কবিতা মনে পড়ে, "দ্য বার্নিং অফ বুকস"। তাতে দেখা যায়, রেজিম যখন ঠিক করেছে সমস্ত বিপজ্জনক বই আগুনে জ্বালিয়ে দেবে, আর বলদে-টানা গাড়িতে করে এনে স্তুপ করছে সমস্ত বইয়ের, একজন বৃদ্ধ কবি দেখলেন তাঁর নিজের বই নেই সেই দাহ্যতালিকায়। বাড়ি ফিরে গনগনে রাগে তিনি রেজিমকে চিঠি লিখছেন, "বার্ন মি!, বার্ন মি" ... "হ্যাভ আই নট অলওয়েজ় টট ট্রুথ ইন মাই বুকস?"


সেই রেজিমের কী পরিণতি আমরা জানি। তবে, সেই থেকে আজ আর আশাবাদ পাই না। আমি শুধু ভাবি শোক - শোক অবয়বহীন। হয়ত, ব্যক্তিগত ছাড়া আর সমস্ত শোক উদ্বায়ীও। 

শামসুর প্রশ্ন করেছিলেন, "আমাকে করেছ অন্ধ, যেন আর নানান দুষ্কৃতি / তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি / তাও কি পারবে মুছে দিতে'?"

এর উত্তর শামসুর দেননি, আর আমাদের-ও জানা নেই। অবশ্য, যে জাতি 'দায় কার?' জিজ্ঞেস করলেই আত্মগতভাবে গেয়ে ওঠে 'আসলে শাসকের নয়, ক্ষমতার নয়, প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনেতার নয়, দায় আমাদের সব্বার - সক্কলের' - সে জাতির নীরবে দাঁড়িয়ে নতমস্তকে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা ও ক্রমে নিজের হাতেই নিজের স্মৃতি মুছে ঘরের কোণে ছায়ায় মিশে যাওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকে?




Comments