পরীক্ষার আগের দিন

আমার-ও ইচ্ছে করছে লিখতে যে আজকে যেমন টেনশন হচ্ছে তেমনটা পরীক্ষার আগেও হতো না, কিন্তু সেটা বললে কাঁচা ঢপ মারা হবে।

কারণ, পরীক্ষার আগের দিন আমরা বিকেল সাড়ে চারটেয় তাপসদায় যেতাম, স্পেশাল চা আর স্পেশাল সিগারেট উড়িয়ে ঘরে ফিরতাম পাঁচ-সাড়ে পাঁচ। তারপর, একদল ফাঁকিবাজ মিলে কারুর একটা ঘরে পড়তে বসতাম, বসেই হেবি ঘুম পেতো। তারপর ব্যালকনিতে গিয়ে কাউন্টারে একটা বিড়ি খেতাম। খেয়ে ভাবতাম যাই জল ভরে আনি গে - বলে জল ভরতে মেসে যেতাম, গিয়ে দেখতাম অতুলদা ক্যারম পেটাচ্ছে, দেখে মনে হতো যাই একটা গেম খেলেই আসি। কী আর হবা? করে একটার জায়গায় গোটা পাঁচেক খেলে সন্ধ্যে ঢলে রাত করে রুমে এসে দেখতাম রুমমেটের পড়া শেষ, সে আনন্দে প্রায়ান্ধকার ঘরে গিটার বাজাচ্ছে। বাকিরা ছত্রভঙ্গ। কেউ কেউ নিজের সিলেবাস শেষ হবে না বুঝে, যাদের শেষ হয়ে গেছে তাদের ঘরে গিয়ে বডি ফেলে দিয়েছে। রিভার্স-অসমোসিস প্রক্রিয়ায় কিছু নোটেশন-টোটেশন যদি ঢুকে যায়।
তখনও, সেই রাত্রে দেখা যেত, আরও বড় দুই বীরযোদ্ধা তখনও সিলেবাস শুরুই করেনি। মনে বল পেয়ে আবার যুদ্ধে যেতাম, কারণ শেক্সপিয়ার বলেছেন ওয়ানস মোর আনটু দি ব্রিচ। এবং বলেছেন যুদ্ধে গেলে বোরোলীনের টিউব পকেটে রাখবা। তো যাই হোক, বারোটা নাগাদ আবার নোটের খাতা খুলে পড়তে বসতাম। এই দুই যোদ্ধার একজন একটু হিংস্র ছিল, তার কোনো থিওরেম ভালো না লাগলে সে ঐ পাতাটাই ছিঁড়ে ফেলত ফড়ফড় করে (ওগুলো চোথা হিসেবে সঙ্গে যেত কী না সে প্রশ্নে ইতিহাস নিরুত্তর!) আর অন্যজন নির্বিকল্প সাধুমানুষ, সে এইসব কেওস দেখে দুটো হাই তুলে বলতো ধুর একটু ন্যাপ নিয়ে নিই, ভোরবেলা উঠে পড়তে বসবো। এবং, বললে পেত্যয় যাবেন না, সে সত্যিই ভোর চারটের সময় আবার উঠে ঠিক যে চারটে জিনিষ দেখে হলে যেতো হেলেদুলে, সেই চারটেই পরীক্ষায় আসতো। একদম প্রত্যেকবার। ঠিক ঐ চারটেই। এবং সে এক ঝুড়ি নাম্বার পেতো।
আমি যেহেতু ভালো বেইজ়িয়ান, তাই আমি শেষের দিকে এসে ঐ উপরিউক্ত সাধুপুরুষ যে চারটে জিনিষ ভোরবেলা ঝালাতেন, আমিও সেই চারটেই ঝালিয়ে বৈতরণী পেরিয়েছি। তবুও, না তার, না আমার - তেমন কিছুই টেনশন হয়নি। এখন তো আমরা দুজনেই টেবিলের এদিকে। সে এখনও ঐরকম-ই আছে। আমিও আর কী বা পাল্টেছি?
কিন্তু, টেনশন কপালে ছিলো, কে খণ্ডাবে? এখন ফি বছর একবার এদিকে এই অবক্ষয়ী পশ্চিম দিগন্তে, নৈলে ওদিকে, নিজের দেশে, এই ভোটের দামামা আর কুনাট্যরঙ্গ।
আর তার মধ্যে দেখি যেদিকে যে পারে একটা করে প্রেডিকশন লাগাচ্ছে। শেষ এইর'ম দেখেছিলাম কোভিডুনিশে, যত্র যত্র নেত্র পড়ে, তত্র তত্র কার্ভ স্ফূরে। সে এমন সব কার্ভ ফিটিং করেছিলেন জনগণ, যে কোথাও কোথাও পপুলেশনের চেয়ে বেশি আক্রান্ত বেরিয়ে গেছিলো। অবশ্য সে ইতিহাস এখন অতীত।
পোলস্টারদের-ও ঐ দশা। কাল দেখি প্রজাপোলের পেন্টুল খুলে দিলেন সন্দীপ চৌধারী। প্রজাপোল বলেছে নাকি ৬ লাখ ৫৩ হাজার লোকের সার্ভে করেছে, ঐ কয়েকদিনে। এতো লোকের সার্ভে করতে নাহোক সাড়ে ছ-হাজার সার্ভেয়ার লাগবে, খরচাও হবে কোটি দুয়েক। তার উপর ২৯৪ টা কেন্দ্র আমাদের, ভাগ করলে দেখা যাবে ২২০০ মত প্রত্যেক কেন্দ্রে। যেখানে শ-দুয়েক, তিনেক হলেই যাকে বলে দুর্দান্ত কভারেজ। এই অল্প সময়ে কী করে এতো সার্ভেয়ার, এত লোক, এত টাকার জোগাড় হল সবেতেই কিঞ্চিত খাবি খেলেন প্রজাপোলের রাওবাবু। দেখে যা বুঝলাম গোটাটাই ঢপের চচ্চড়ি। রাগ-ও হয়, লোকে এইসব বালবাজারি করে, আর বদনাম হয় স্ট্যাটকাকুদের। কী একটা অনাচার! আর দেখলাম প্রজাপোলকে ল্যাজেগোবরে হতে দেখে অ্যাক্সিসের প্রদীপবাবু খুব দাঁত শুকোচ্ছেন। ওরাই এবার যা একটু বিচক্ষণতা দেখিয়ে আউটসাইড দি অফস্ট্যাম্প দেখে খোঁচা মারেননি বলে, মানে, কিছুই বের করেননি।
অতএব, না আঁচালে, আঁচালে কেন ... খেয়েদেয়ে উদ্গার না তোলা অব্দি শান্তি নাই। চাদ্দিকে তাকিয়ে দেখি কোথাওই ঘৃণা ছাড়া নেতাদের বিশেষ কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, চোখের সামনে ক্যু-ডাক দেখেও অল্পবয়সী নেতা রিল বানিয়ে বিল কাটছেন, না হলে ভেবেছেন তেড়ে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করেই ফ্যাসিজম রুখে দেবেন, ওরাও বোধহয় আমাদের মতই - ভেবেছেন লাস্ট মিনিট গাঁতিয়েই স্টেজে ম্যানেজ দেবেন, কে জানে?
আর ওদিকে ডান-বাম দুইদিকে দুই বিকাশপুরুষ পুরাই গান্দো থায়ো ছে, সঙ্গে সঙ্গে নাচছেন তাদের জোম্বিসেনার দল, তাই আপাতত যেটুকু যা গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা সেটুকু সেইসব মানুষের হাতে যাদের সাথে আমাদের কক্ষপথের মিল নেই কোনো, যারা আমাদের সিলেবাসের বহু বহু বাইরে, তো সেখানে আর টেনশন না করেই বা কী আর করে মানুষ?




Comments