প্যারালাক্স এরর

 (আজ একটা মজার জিনিষ লিখে রাখি, নেহায়েতই ব্যক্তিগত স্মৃতির জন্য। অ্যাকাডেমিয়ার অন্ধকার দিক নিয়ে প্রায়ই উষ্মাপ্রকাশ করি, অভিমান করি। আমার থেকে বয়সে ছোটো কত ভবিষ্যত অ্যাকাডেমিক আছেন, তাদের যেন মনে না হয় এই দিকে শুধুই অন্ধকার, কিছুই আলো নেই। আলোর বন্যা না হলেও, কয়েকটি উজ্জ্বল বিন্দু আছে।)

এই পোস্টের প্রথম ছবিটা অ্যাস্ট্রোনমি ম্যাগাজ়িনের, প্রকাশিতব্য জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যার কভার স্টোরি - এই আগামী সংখ্যার বিষয় গেইয়া স্পেসক্রাফট : "How Gaia revealed the milky way"! কেন গেইয়া-কে নিয়ে আগামী সংখ্যা? কারণ এই ২০২৫ সালের দশ-দশটা বছর কক্ষপথে ঘুরে ২ বিলিয়ন জ্যোতিষ্কের ৩ ট্রিলিয়ন অবজার্ভেশন নেওয়ার পর, শেষমেশ সে অবসর নিয়েছে। ২০১৩ সালে গেইয়া উৎক্ষেপণের সময় লক্ষ ছিল, "টু ম্যাপ আ বিলিয়ন স্টার" - সেই লক্ষ্য যে পূরণ হয়েছে শুধু তাই না, এর মাঝে গেইয়ার ম্যাপে ধরা পড়েছে ব্রাউন ডোয়ার্ফ, এক্সোপ্ল্যানেট, কোয়াসার, এমন কী মিল্কি ওয়ের স্যাটেলাইট গ্যালাক্সির ছোট্ট ছোট্ট তারার শহর (স্টেলার সিটি)। কোন সুদূর অতীতের কোন কলিশনের ফলে আমাদের মিল্কি ওয়ের আকৃতি কেমন হয়েছে সেইসবের-ও আভাষ পাওয়া গেছে কিছু কিছু। আরও কত যে পাওয়া যাবে অনাগত ভবিষ্যতে, এক্ষুণি বলা ভারি শক্ত। পুরো সার্ভের বিপুল পরিমাণ ডেটা পাবলিক ডোমেইনে আসতে আসতে হয়তো আরও বছর কয়েক লেগেই যাবে।



কিন্তু এই জ্যোতির্বিজ্ঞানের গল্পে রাশিবিজ্ঞানের ভূমিকা কী? সেইটেই আমাদের আসল আগ্রহ। আসলে, এই ব্যাপক সার্ভের তথ্য-উপাত্ত থেকে বহু-বহুদূরের একটি তারার সত্যিকারের দূরত্ব মাপা বেশ কঠিন এক সমস্যা। যে পদ্ধতিতে আমরা, মানে আমরা মানুষেরা, মাপি সেটির নাম প্যারালাক্স এস্টিমেশন। সঙ্গের ছবিদুটি দেখলেই আশা করি পরিষ্কার বোঝা যাবে, জিনিষটা কেমন। ছোটোবেলার পদার্থবিদ্যার বইয়ে পড়া প্যারালাক্স এরর মনে পড়তে পারে। অথবা মনে পড়তে পারে নব্বুইয়ের জনপ্রিয় গান, "ভেবে দেখেছো কি? তারারাও কত আলোকবর্ষ দূরে?"
খুব সহজ করে বলতে গেলে, প্যারালাক্সের অর্থ এই যে, দর্শকের অবস্থান যেমন যেমন করে পাল্টাবে, তার পরিপ্রেক্ষিতে কাছের ও দূরের বস্তুর আপাত অবস্থান-ও পাল্টাবে। নিচের দ্বিতীয় ছবিটি ঐ অ্যাস্ট্রোনমি ম্যাগাজিনের-ই। আর ছবিতে যেমন দেখানো, গেইয়া স্পেসক্রাফট সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যিখানের কোনো একটি দূরত্বের কক্ষপথে ঘুরতে এক-ই তারার ছবি ছ'মাসের ব্যবধানে দুবার যদি তোলে - একবার শীত, আরেকবার গ্রীষ্মে - তাহলে ঐ দুইবারের ছবিতে এক-ই তারার সাথে গেইয়ার দৃষ্টিপথ দিয়ে সরলরেখা টানলে যে কোণটি দেখা যাবে, সেইটিই (বা তার অর্ধেক) আমাদের প্যারালাক্স অ্যাঙ্গেল।




আর বাকিটুকু ত্রিকোণমিতি - প্যারালাক্স কোণ আর দূরত্বের সম্পর্ক ঐ ছোটোবেলার ট্যানজেন্ট, অর্থাৎ লম্ব আর ভূমির অনুপাত, পারপেণ্ডিকুলার ডিভাইডেড বাই বেস। আর, আসলে যে সমীকরণ ব্যবহার করা হয় সেইটা আরও সোজা কারণ খুব ছোট্ট পিচ্চি কোণের জন্য রেডিয়ানে মাপলে tan(𝜃)≈𝜃। অর্থাৎ, এক লাইনে লিখলে r = 1/w, যেখানে তারার দূরত্ব r parsec, আর ঐ প্যারালাক্স কোণের মাণ w ... পারসেক কাকে বলে সেই সংজ্ঞা ছবিতেই দেওয়া, তবুও, ১ আর্কসেকেণ্ড প্যারালাক্স কোণের অর্থ, তারাটি ৩.২৬ আলোকবর্ষ দূরে আছে, এই দূরত্বের এককটিই পারসেক (প্যারালাক্সের পার, আর আর্কসেকেণ্ডের সেক।)



এতো অব্দি খুব শিশিবোতল হয়ে, ট্যান না গেলে, আরেকটু বলি, কেন আমি এই নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত? কারণ, এই প্যারালাক্স অ্যাঙ্গেলের ডেটা পাওয়া যায় গেইয়ার পাব্লিক ডেটা রিলিজ় থেকে, যার শেষ পাবলিক রিলিজ় হয়েছিল ২০২২ সালে। কিন্তু, প্যারালাক্স অ্যাঙ্গেলের ডেটা পেয়ে গেলেই যে সমস্যার শেষ তা নয়। মেজ়ারমেন্ট এরর কোথায় যাবে? সে তো আস্তিকের ঈশ্বর এবং নাস্তিকের বানানভুলের মত সর্বত্রব্যাপী - অমনিপ্রেজেণ্ট। তবে কি না, ভাগ্যিস সে আছে, নৈলে আমরা এই রাশিবিজ্ঞানীরা আর কী লইয়্যা থাকতাম?
গল্পটা তবে এই, যে সেইসব মেজ়ারমেন্ট এরর-কে মডেলে ধরতে গেলে যে স্ট্যাটিস্টিকাল মডেল-টি দাঁড়ায়, সেটাকে সহজ কোনো উপায়ে সামলানো যায় না, তার প্যারামিটার এস্টিমেট করতে গেলে দেখা যায় আপাতদৃষ্টিতে যেসব মেথড দুর্দান্ত কাজ করে, এইটি এমন বেয়াড়া প্রবলেম যে সেইগুলি সব ফেইল। ফেইল হওয়ার একটি কারণ এক-একটি অ্যাঙ্গেলের জন্য একটিমাত্র ডেটা-পয়েন্ট, আর অন্য কারণ কোণ আর দূরত্বের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। সেইটার সাথে মেজ়ারমেন্ট এরর জুড়ে গেলে অন্তত দুটো ঝামেলার কারণ এসে উপস্থিত হয়, এক, নন-লিনিয়ারিটি এবং দুই, হেভি-টেইল। হেভি টেইলের গল্প ছোটো করে করা অসম্ভব। তবুও, খুব সহজে বলতে গেলে, আমাদের সরল রাশিবিজ্ঞানের সর্বত্র যে নর্ম্যাল ডিস্ট্রিবিউশন কাজে লাগানো হয়, সেইটি লাইট-টেইলড, পাতলা ল্যাজ, সে যাকে বলে ওয়েল-বিহেভড, মোটামুটি প্লাস-মাইনাস থ্রি সিগমার মধ্যে প্রায় সবটুকু এঁটে যায়, তার বাইরে দান পড়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, তাই নর্ম্যালের জন্য হাজার-একটা থিওরি-ইত্যাদি আছে। এর বাইরের জগত হেভি টেইল, সে বলে যে প্রোবাবিলিটি ডিস্ট্রিবিউশনের ল্যাজ বেশ মোটা, পলিনমিয়ালের মত আস্তে আস্তে কমছে, ফলতঃ, মাঝে-মাঝেই উটকো বিশাল বড় অবজার্ভেশন দেখতে পাওয়া বিচিত্র তো নয়ই, সে এতোই ল্যাজ মোটা যে কখনও-সখনো তার জন্য নর্ম্যালের জন্য তয়ের প্রায় কোনো তত্ত্ব-ই খাটে না।
তার মানে এই নয় কিছুই করার নেই, এই ধরণের কিঞ্চিত বেয়াড়া সমস্যায় রাশিবিজ্ঞানের একটি শাখা - বেইজ়িয়ান ইনফারেন্স দুর্দান্ত কাজ করে। আনন্দের ব্যাপারটা এই যে, আমি দুজন অত্যন্ত প্রিয় জুনিয়র কোলাবরেটরের সাথে এই নিয়ে বেশ বছর দুয়েক ধরে এই প্যারালাক্স এররের বেইজ়িয়ান মডেলিং করেছি। আমরা দেখাতে পেরেছি যে এই আমাদের মতন বেইজিয়ান ফ্রেমওয়ার্কে হেভি-টেইলড এরর ধরা যায় খুব সহজে, এবং তাহলে সমাধানের রাস্তায় এক পা হলেও এগুনো সম্ভব। এই দুজনের একজন সোহম, সে এখন উইসকন্সিন ম্যাডিসনের ফাইন্যাল ইয়ার পিএইচডি, অন্যজন উত্তরণ, এখন জর্জিয়া টেকে পিএইচডি ছাত্র। কেউ পড়তে চাইলে, লিঙ্ক এইখানে - https://arxiv.org/abs/2410.20641


আর যেটা না বললেই নয়, যে এই প্রবলেমটার কথা জানতে পেরেছিলাম কী করে? আমাদের এক বর্ষীয়ান বেইজ়িয়ান রাশিবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান রোব্যেরের একটা ব্লগপোস্ট থেকে। ভাগ্যিস উনিও শক্ত পেপার ছাড়াও ব্লগ লিখেও সময় নষ্ট করেছিলেন! সেই ব্লগের-ও লিঙ্ক কমেন্টে।
যাই হোক, এটা আমাদের পেপারের বিজ্ঞাপনী বিরতি নয়, যদিও কিঞ্চিৎ ঢাক পিটিয়েই ফেলেছি যা দেখা যাচ্ছে। সে পেপার-টেপার একদিন বেরুবে আশা করি, অজস্র হার্ডল টপকে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আশা এই যে গেইয়া-র সেই আশ্চর্য ট্রিলিয়ন তারার ঝকমকির মাঝে কোথাও আমাদের এই মিল্কি ওয়ের একটা খুব ছোট্ট একটা গ্রহের আরো ছোটো ক'জন মানুষ এইসব আশ্চর্য অদ্ভুত ব্যাপার ভাবতে ভাবতে, রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হবে।
হয়তো তাদের মনে হবে, শুধু বিস্মিত হতে পারাই জীবনের সার্থকতা - এইটুকুই জীবনের অর্থ, এর বেশি কিছু নেই।

Comments