নাইনটিন এইট্টি-ফোর, এবং

 

নাইনটিন এইট্টি-ফোর, এবং

টোটালিটারিয়ানিজ়ম ও প্যান-অপটিকন সম্বন্ধে দুটো কথা

“War is peace.

Freedom is slavery.

Ignorance is strength.”

― George Orwell, 1984


শুরুর আগে দুটো কথা না বললেই নয়। প্রথমত, ১৯৮৪ পড়া না থাকলে আগে বইটি পড়ুন, তারপর এইটি। কারণ, ১৯৮৪-কে টোটালিটারিয়ান রেজিমের উপর একটি কমেন্টারি সাহিত্য ভেবে, ঐ পৃথিবী থেকে বিচ্যুত করে পড়লে হবে না, পড়তে হবে এই ভেবেই যে ঐ টোটালিটারিয়ান রেজিম যে পথে এসেছে ও আসছে, সেই পথের আশেপাশেই বিস্তর প্রাঞ্জল উদাহরণের মতই ১৯৮৪ ছিল। ১৯৮৪ একক বা স্বতন্ত্র নয়, সেই অর্থে তীব্রতম কমেন্টারিও নয়, অরওয়েলের নিজের-ই লেখা অ্যানিমাল ফার্ম, ব্র্যাডবেরির ফ্যারেনহাইট ৪৫১, হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড, আরও কিছুটা সাম্প্রতিক মার্গারেট অ্যাটউডের হ্যাণ্ডমেইড’স টেল, লইস লউরি’র দ্য গিভার, করম্যাক ম্যাককার্থির রোড। মনে পড়ছে এই ২০২৪ সালেই সামাজিক মাধ্যমের ভাইরাল একটি ছবি, হ্যাণ্ডমেড টেলের হ্যাণ্ডমেডদের মত তীব্র লাল ড্রেস, মাথায় বেঢপ শাদা বনেট পরে ভোট দিচ্ছেন জনৈকা। রিপাবলিক অফ গিলিয়াড-ই যে পরের স্টেশন, উনি জানতেন। 


ডিস্টোপিয়ান ফিকশন যে অন্যতম জনপ্রিয় জঁর, এর থেকে মালুম হয় ডিস্টোপিয়াই হয়তো এই যুগের ভুতপেতরীদত্যিদানোর রূপকথা, হাইরাইজ় গুহার অন্ধকারে ফোনের আগুনকে ঘিরে ধরে ক্যাটাস্ট্রফির গল্প শুনে ঘুমোতে যায় মানুষ। সে ভাবে, এইসব সাঙ্ঘাতিক জিনিষপত্র নিশ্চয়ই আমাদের সাথে হবে না। পাস্ট ইজ় আ ডিফারেন্ট কান্ট্রি। 


তবুও মনে মনে সে জানে, হওয়া কিছুই অসম্ভব না। “টির‍্যানি, টোয়েন্টি ফার্স্ট লেসনস ফ্রম টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি” বইয়ের শুরুতেই অধ্যাপক টিমোথি স্নাইডার বলছেন, যে নাৎসি উত্থানের ঠিক আগের জার্মানির লোকজন মোটেই এমন কিছুই উজবুক বা বোকা ছিলেন না, তাদের বিচারবুদ্ধি আমার-আপনার থেকে কম ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ-ই থাকতে পারে না, তবুও গ্যেথের দেশে একদিন থার্ড রাইখের উত্থান হয়েছে। তারাও হয়তো ভেবেছিলেন, না না আমাদের সাথে হতেই পারে না। আমরাও কী ভাবিনি? ভেবেছি, হয়তো ভাবি। “কিছু ভয় রাতের জন্য সঞ্চিত থাকে”। তবুও, চেতাবনির মূল্য কমে না। 


কিন্তু চেতাবনি বিখ্যাত হলে কি তার ধার কমে যায়? বহুব্যবহারে অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যায়? বলা শক্ত। ১৯৮৪-র শেষ লাইনটিই যেমন, “The party told you to reject the evidence of your eyes and ears. It was their final, most essential command” - উক্তিটির খ্যাতি বইয়ের সমতুল্য বললে ভুল বলা হবে না। ঠিক এই লেখাটি লেখার সময়েই সার্চ করে দেখি, এই কয়েক ঘন্টায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক তাজা খবরের ক্লিপিং পোস্ট করেছেন সামাজিক মাধ্যমে, সঙ্গে ক্যাপশন এইটি। মিথ্যে তো নয়। বাজার অগ্নিমূল্য, চাকরি অপ্রতুল, যুদ্ধের আগুন বিশ্বজুড়ে, ঘৃণার ক্যান্সার আমাদের শেষ করে দিয়েছে কিন্তু সংবাদ মাধ্যম আপনাকে সুচারুভাবে বুঝিয়ে চলেছে, না না আসলে সব-ই শান্তিকল্যাণ। 


মূল আলোচনায় ফিরি। ১৯৮৪-র দুটি মূল থিম যদি ধরি টোটালিটারিয়ান রেজিম ও সার্ভেইলেন্স স্টেট। আমি এই দুটি থিমই ঘুরেফিরে দেখবো এই লেখায়। ১৯৮৪-কে দুই একবার বুড়িছোয়াঁ ছুয়েঁ, অবশ্যই। 

তাহলে প্রথমটি নিয়ে একা হ্যানা আরেণ্ট অজস্র লেখা লিখেছেন, আইকম্যানের বিচার দেখে এসেই লিখেছেন আইকম্যান ইন জেরুসালেম: ব্যানালিটি অফ ইভল, পার্সোন্যাল রেস্পন্সিবিলিটি আণ্ডার ডিকটেটরশিপ। টোটালিটারিয়ান রেজিমের স্বরূপ জানতে ঐ বইগুলির আজও বিকল্প নেই। আর, রাষ্ট্রের নজরদারি অর্থাৎ মাস সার্ভেইলেন্স নিয়েও আরো গভীরে ভাবতে গেলে হয়তো ফিরে যেতে হবে মিশেল ফুকোর কাছে, ডিসিপ্লিন অ্যাণ্ড পানিশ, “প্যান-অপ্টিকন”, বা তারও আগের জেরেমি বেন্থ্যামের কাছে। 


নাইনটিন এইট্টি ফোরের পটভূমি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্র ওশিয়ানিয়ায়, যেখানে সর্বশক্তিমান পার্টি এবং সেই পার্টির মুখ কিংবা মুখোশ,  বিগ ব্রাদার, মানুষের চিন্তা, ভাষা, স্মৃতি, এবং ইতিহাস -  সবকিছুর উপরেই কায়েম করেছে টোটাল কন্ট্রোল - সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট উইনস্টন স্মিথ, মিনিস্ট্রি অফ ট্রুথের এক সামান্য কর্মচারী, সে কাজ রাষ্ট্রের ইতিহাস-নতুন-করে-লেখার যন্ত্রে। তবুও মনে মনে অঙ্কুর গজায় বিদ্রোহের; “সত্যি”টা আসলে কী, সেইটুকু মনে রাখার আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে রাখে সে, রাষ্ট্রের অগোচরে। উপন্যাস যত এগোয়, আস্তে আস্তে আমরাও এগিয়ে যাই অবশ্যম্ভাবী অন্তিমের দিকে। “নায়িকা” জুলিয়ার সঙ্গে তার নিষিদ্ধ সম্পর্ক, অতীতের খোঁজ, এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্বপ্ন ধীরে ধীরে তাকে রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী করে তোলে। শেষ পর্যন্ত পার্টির নিষ্ঠুর শাস্তি, ব্রেনওয়াশ, এবং ভয়ের মাধ্যমে তাসের ঘরের মতই ভেঙে পড়ে উইনস্টনের প্রতিরোধ। শুধু প্রকাশ্যে নয়, অন্তরেও বিগ ব্রাদারকে ভালোবাসতে শেখে সে। যদি নীতিবাক্যে ধরতে হয়, তাহলে আমি লিখবো এই যে, অরওয়েলের উপন্যাসের মূল সুর এই যে টোটালিটারিয়ান ক্ষমতা একদিন কেবল শরীরকে নয়, আমাদের সত্যি থেকে মিথ্যেকে আলাদা করে দেখার ক্ষমতাকেই সম্পূর্ণ কব্জা করে নেয়, মগজের দখল নিয়ে নেয়। এর থেকে উত্তরণের পথ নেই। অন্তত, অরওয়েলের ওশিয়ানিয়ায় নেই। 



—

মাস-সার্ভেইলেন্স

“Big Brother is Watching You.”


একটি আদর্শ বা বলা ভালো দক্ষ জেলখানা ঠিক কেমন হওয়া উচিত? অষ্টাদশ শতকের সমাজবিজ্ঞানী জেরেমি বেন্থ্যাম এই চিন্তার সূত্র ধরেই ‘আবিষ্কার’ করেন প্যান-অপ্টিকন। কেমন সেই নকশা? কল্পনা করুন একটি বৃত্তাকার কারাগার, ছবিতে যেমন, তার পরিধি বরাবর বিভিন্ন কুঠুরিতে আছেন বন্দীরা, আর বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে একটি ওয়াচ-টাওয়ার, যেখানে বসে অষ্টপ্রহর নজর রাখার জন্য একজন কারারক্ষী বা জেলের ওয়ার্ডেন। কিন্তু সেই ওয়াচ-টাওয়ারের কাচটি ওয়ান-ওয়ে, অর্থাৎ, কারারক্ষী যে কোনো সময়েই দেখতে পাচ্ছেন বন্দীদের, কিন্তু বন্দীরা জানে না কখন তাদের উপর নজর রাখা হচ্ছে, বা হচ্ছে না। সেই ওয়াচ-টাওয়ারের আড়ালে নজরদারের সর্বক্ষণের অদৃশ্য উপস্থিতি। বেনথ্যামের নিজস্ব বর্ণনায়, “The Building circular – an iron cage, glazed – a glass lantern about the size of Ranelagh – The Prisoners in their Cells, occupying the Circumference – The Officers, the Centre. By Blinds, and other contrivances, the Inspectors concealed from the observation of the Prisoners: hence the sentiment of a sort of invisible omnipresence.” জেরেমি প্যান-অপ্টিকনের নকশা তৈরি করেছিলেন নিজের ভাই স্যামুয়েলের সাথে, যিনি এই আদলেই নজর রাখতে চেয়েছিলেন পোটেমকিন এস্টেটের শ্রমিকদের উপর। 


এর ফল কী সহজেই অনুমেয়। যদি একজন মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় যে সারাক্ষণ-ই অদৃশ্য কোনো প্রহরী নজরদারি করছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ কেউ লক্ষ করছে আড়ালে বসে, সে কি নিজে থেকেই যাবতীয় নিয়ম, আইন মেনে চলবেন না? শুধু জেলখানার নকশা নয়, জেরেমির ইচ্ছা ছিলো এই এক-ই প্যান-অপ্টিকনের আদলে তৈরী হতে পারে স্কুল, কারখানা, হাসপাতাল। এমন কী অ্যাসাইলাম। 


জেরেমি বেনথ্যামের প্যান-অপ্টিকন সেই সময়ে জনপ্রিয় হয়নি, বরং ন্যায্য কারণেই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। সেই প্যান-অপ্টিকন খ্যাতির আলো পেলো দুশো বছর পরে বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকোর হাত ধরে। তবে, এই বিংশ শতাব্দীর প্যান-অপ্টিকন আর শুধু ইঁট-পাথর-সিমেন্টের বিল্ডিং নয়,  ফুকো “ডিসিপ্লিনারি সোশাইটি”র আলোচনায় বললেন, এই প্যান-অপ্টিকন-ই ক্ষমতার এবং নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র। আরও একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, যে ক্ষমতা এখানে আসলে নলেজ বা তথ্যর অধিকার-ও বটে, আপনি ক্ষমতাহীন তাই আপনি জানেন না আপনি কখন নজরাধীন, রাষ্ট্র সর্বক্ষমতাসম্পন্ন তাই সে সবসময়েই জানে আপনার গোপনো কথাটি। 


ফুকো-বেনথ্যামের প্যান-অপ্টিকনের খ্যাতির শিখরে চড়া সম্পূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক খ্যাতি বা কুখ্যাতি পেলো মাইকেল র‍্যাডফোর্ডের নাইনটিন এইট্টি ফোরের সিনেমাটিক অ্যাডাপ্টেশনে। উপন্যাসের সার্ভেইলেন্স ডিভাইসগুলির নাম অরওয়েল রেখেছিলেন টেলিস্ক্রিন। অরওয়েলের উপন্যাসের পটভূমি যে কাল্পনিক ওশিয়ানিয়ায় সেখানে টেলিস্ক্রিনের উপস্থিতি পাবলিক থেকে প্রাইভেট সমস্ত বৃত্তে, । অরওয়েল লিখেছেন, "there was of course no way of knowing whether you were being watched at any given moment ... you had to live ... in the assumption that every sound you made was overheard, and, except in darkness, every movement scrutinised". প্যান-অপ্টিকন ছাড়া, টেলিস্ক্রিন, আর কীই বা তবে? 



আরও ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, এই ২০২৫ সালে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেটি আসলেই একটি বৃহৎ ডিজিট্যাল প্যান-অপ্টিকন, অন্তত যারা এই লেখা পড়বেন তাদের জন্য তো বটেই। সামাজিক মাধ্যম - যার হওয়ার কথা ছিল বিশ্বজোড়া মানুষের যোগসূত্র এবং খোলামাঠ - তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐ বৃহৎ প্যান-অপ্টিকনের একটি অল-সিয়িং আই। এই মুহূর্তেই, সামাজিক মাধ্যমের সমস্ত গতিবিধির উপর নজর রাখে রাষ্ট্র, এবং সেই সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলার শাস্তি সাংঘাতিক। চাকরি চলে যাওয়া থেকে কারাদণ্ড, কিংবা কমপক্ষে অনলাইন হ্যারাসমেন্ট তো নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। পেগাস্যাস প্রোজেক্টের কথা হয়তো সকলের না হলেও অনেকের-ই জানা। গোটা বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশ হাজার ফোন এবং ফোনের সঙ্গে জুড়ে থাকা অন্য যন্ত্রে পেগাস্যাস স্পাইওয়্যার ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল, শুধুমাত্র নজরদারির লক্ষ্যে। সেই নজরবন্দীর তালিকায় প্রায় তিনশো জন মানুষ ভারতের বিভিন্ন সাংবাদিক, বিরোধী নেতা, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী বা অ্যাক্টিভিস্ট। 


পেগাস্যাস না হয় গোপন নজরদারি, প্রকাশ্যেও মাস সার্ভেইলেন্স কিছুই এমন বিরল নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের নিয়মের মধ্যেই এখন ঢুকে গেছে “এক্সট্রিম ভেটিং” - চূড়ান্ত বাছাই, যার অন্যতম ধাপ সোশ্যাল মিডিয়ার হ্যাণ্ডলের তথ্য জমা করা, এবং সে তথ্যকে উন্মুক্ত করে দেওয়া যাতে রাষ্ট্রের কাছে। গোপনীয়তা অর্থাৎ প্রাইভেসির হদ্দমুদ্দ। 


অনলাইন গতিবিধির উপর নজরদারি তো আজকের না, বহুদিন-ই ছিলো, এবং তার সপক্ষে যুক্তিও নেই এমন নয়। সত্যিই, ইন্টারনেট এক এমন দুনিয়া তাতে যে কতো রাক্ষস লুকিয়ে আছে, কত নাশকতার ছক কোথায় চলছে তার লেখাজোকা নেই। অতএব, সুরক্ষার ভারের সাথে সাথে আমাদের ছেড়ে দিতে হচ্ছে গোপনীয়তার আশাও। কিন্তু শুধুই কী প্রতিরক্ষা? নাঃ। জড়িয়ে আছে ব্যাবসায়িক স্বার্থ থেকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ - সবই। এবং, এইসবের বাড়বাড়ন্ত হওয়ার একটি অন্যতম কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই কোনো প্রকৃত প্রস্তাবে কার্যকরী তথ্য রক্ষার প্রোটোকল বা রোবোট সার্ভেইলেন্স আইন না থাকা। তার সাথে তাল মিলিয়েছে প্রযুক্তির উর্ধ্বশ্বাস প্রগতি। যার নতুনতম অস্ত্র হয়েছে এ-আই, বাংলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংক্ষেপে কৃবু। কৃবুর আলোচনায় বিস্তারে না ঢুকেও ছোটো করে এইটুকু বলা খুব মিথ্যা হবে না, যে তার আসল ক্ষমতা অজস্র পরিমাণের তথ্য-উপাত্ত এক-ই সাথে প্রোসেস করে কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো। সে সিদ্ধান্ত ঠিক না ভুল, সে মানবিক না দানবিক, সে প্রশ্ন করার লোক বিরল। তাই, কৃবুর সাহায্যে বিগ-ব্রাদার হয়ে উঠবেন আরও আরও শক্তিশালী। গোপনো কথাটি কিছুতেই আর রবে না গোপনে। 


অতএব, উপায়? এও বলেই দিয়েছেন অরওয়েল। ঐ উপন্যাসের-ই একটি অমোঘ বাক্যে। 


“If you want to keep a secret, you must also hide it from yourself.”



—


টোটালিটারিয়ানিজ়ম

“If you want a picture of the future, imagine a boot stamping on a human face—forever.” 


নাইনটিন এইট্টি ফোরের দ্বিতীয় যে সূত্রটি বা থিমটি আলোকপাতের দাবি রাখে, সেইটি “টোটালিটারিয়ানিজ়ম” (Totalitarianism)। টোটালিটারিয়ানিজ়ম বলতে এমন এক ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কেবল মানুষের রাজনৈতিক আচরণই নয়, বরং তার চিন্তা, বিশ্বাস, ভাষা, স্মৃতি, নৈতিকতা, হেন জিনিষ নেই যাতে পূর্ণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায় না। এখানে বোঝার ব্যাপার এই যে টোটালিটারিয়ান রেজিমের ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং, টোটালিটারিয়ানিজ়ম একটি সর্বগ্রাসী আদর্শ। আসলে এই এক এমন অবস্থা, যেখানে নিরঙ্কুশ শাসন, সর্বব্যাপী নজরদারি, ভয়ের রাজনীতি, এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সম্পূর্ণ বিলোপের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেকে সমাজের সঙ্গে একাকার করে ফেলে। Hannah Arendt, এর ভাষায়, এটি এমন শাসন যেখানে মানুষকে আর নাগরিক হিসেবে নয়, বরং আদর্শ বাস্তবায়নের কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, যেখানে আনুগত্য শুধু আচরণে নয়, চাই অন্তরতম অন্তরেও। 


টোটালিটারিয়ান রেজিমের একটা বিশেষ লক্ষণ সমস্ত পাবলিক ইনস্টিটিউশনেই ঘোগের বাসা বানিয়ে তাদের একে একে নষ্ট করে ফেলা, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে শূন্য করে দেওয়া। এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে পুরো সিস্টেম এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ-ও আর ভরসা রাখতে পারে না যে পুলিশ বা প্রশাসন বা আইন-আদালতের উপর, বা কোনো সংবাদমাধ্যমের উপর। কারণ একটি টোটালিটারিয়ান রেজিমের প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি আসন আলো করে বসে থাকে জো-হুজুরি করে চলা চাটুকার। যোগ্যতার বদলে বিশ্বস্ততা যাদের একমাত্র মাপকাঠি। হ্যানা আরেন্ট, একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন, যা (দুর্ভাগ্যবশতঃ) পুরোনো হওয়ার নয় কোনোদিন-ই,


“Totalitarianism in power invariably replaces all first-rate talents, regardless of their sympathies, with those crackpots and fools whose lack of intelligence and creativity is still the best guarantee of their loyalty.”


জতুগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে তত্ত্বকথা অশ্লীল মনে হতে পারে, পাঠক, তাও, আর কী কী বলেছিলেন অর্ধশতাব্দী আগে Hannah Arendt? বলেছিলেন,  


"Those who choose the lesser evil forget very quickly that they chose evil." 


উনি এও বলেছিলেন, সাংঘাতিক গণহত্যার পরেপরেই গোটা মানবসভ্যতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ইচ্ছে করে, যেমনটি হয়েছিলো জর্মনিতে, কিন্তু সেই collective guilt আসলে একটা ফ্যালাসি বই কিছু না, "There is no such thing as collective guilt or collective innocence; guilt and innocence make sense only if applied to individuals"!


অকল্পনীয় বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি না, কোথা থেকে কী হয়ে গেলো, বুঝতে পারি না একটু একটু করে আমাদের-ই প্রত্যেক দিনের আপোষ, এক-একটা সামান্য নৈতিক বিচ্যুতি জমতে জমতে একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে অপরাধের যথেষ্ট শাস্তি নেই আমাদের অভিধানে, আর ক্ষমা তো প্রশ্নাতীত। কিন্তু তবুও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ তো একেবারেই এড়ানো যায় না, তাই না? আমি-আপনি কেউ তার ব্যতিক্রম নন। সে দায়িত্ববোধ শুধু হাওয়া মেপে দিকে-দিগন্তরে বিচারের বাণী ছড়িয়ে আর নিজেকে ছাড়া বাকি সবাইকেই কাঠগড়ায় তুলে শেষ হয় না। সেই দায়িত্ববোধের একটুখানি বোধ করি খানিকটা অকৃত্রিম ঘৃণা আর রাগ মনের মধ্যে পুষে রাখা, কারণ এখনো অনেক দীর্ঘ রাত্রি বাকী। অ্যারেন্ট বলেছিলেন যে নিতান্ত সাধারণ মানুষ যারা পিষে যাবেন জেনেও ঐ বিশাল চাকার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, আর প্রতিবাদ করতে সাহস করেছিলেন, তাদের আর কিছু ছিলো না নৈতিক বিশ্বাসটুকু ছাড়া। সক্রেটিসের মতো তারাও ভাবতে পেরেছিলেন, "it is better to suffer an injustice than to commit one!”


সেইটুকুও কি আমার/আমাদের আর অবশিষ্ট আছে? জানি না। তবে নিজের সাথে একান্তে একটু অপ্রিয় কথা বলাই যায়, নিজেকে নিজে অস্বস্তিকর প্রশ্ন-ও করাই যায়, অথবা সব কিছু শেষ হয়ে গেলেও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আবছা অথবা স্পষ্ট দাগ-ও খোঁজাই যায়। প্রকাশ্যে হোক বা না হোক, যদ্দিন বেঁচে আছি, সেই নিজের সাথেই তো বাঁচতে হবে, তাই না?

কিন্তু এই সমস্ত আলোচনা শুধুমাত্র যদি“রাষ্ট্র” নামক এক মনগড়া দত্যিদানোর দিকে আঙুল তুলে-ই থামে, তাহলে ভুল হবে। কারণ টোটালিটারিয়ান ক্ষমতা কখনোই শূন্যে জন্মায় না। আমাদের সামাজিক সমঝোতা, হিরণ্ময় নীরবতা, আর সুবিধাজনক বিস্মরণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নিজের জায়গা পাকা করে নেয়। আর ঠিক সেইখানেই ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি উঠে আসে, অস্বস্তিকর, কিন্তু অনিবার্য হয়ে, আয়নার সামনে দাঁড় করায় আমাকে, আপনাকেও। 

 


Comments